ভারতের বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর একটি ‘আম্বানি’। প্রয়াত ধীরুভাই আম্বানির দুই ছেলের একজন মুকেশ আম্বানি এখন এশিয়ার শীর্ষ ধনী। আর ছোট ছেলে অনিল আম্বানিকে ‘ফ্রড’ বা ‘প্রতারক’ ঘোষণা করেছে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই)। পাশাপাশি তার মালিকানাধীন কোম্পানি রিলায়েন্স কমিউনিকেশনসকেও ফ্রড ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে প্রতারক ঘোষিত অনিলের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)।
ভারতীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) জানিয়েছে, অনিল আম্বানির রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস লিমিটেড প্রায় ১৪ হাজার কোটি রুপির ঋণ জালিয়াতি করেছে। প্রতিবেশী দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী সংসদকে জানান, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নির্দেশিকা অনুসরণ করে গত ২৪ জুন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস এবং এর প্রমোটর অনিল আম্বানিকে ‘প্রতারক’ শ্রেণীভুক্ত করেছে।
পঙ্কজ চৌধুরী আরবিআইয়ের যে নির্দেশিকার কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি হলো ‘ফ্রড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ক মাস্টার ডাইরেকশন। এ নির্দেশনাটি প্রণয়ন করেছিলেন আরবিআইয়ের সাবেক গভর্নর রঘুরাম গোবিন্দ রাজন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২৩তম গভর্নর ছিলেন তিনি। ঋণখেলাপিদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতেই নন্দিত এ অর্থনীতিবিদ ‘ফ্রড’ ঘোষণার এ নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত ‘প্রতারক’ কুখ্যাতি থেকে বাঁচতে ভারতের অনেক ঋণখেলাপিই ব্যাংকের অর্থ ফেরত দিয়েছেন। এতে দেশটির খেলাপি ঋণের হার দ্রুতগতিতে কমেছে। ২০১৭ সালেও যেখানে ভারতের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১২ শতাংশ, সেটি এখন ২ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।
ভারতের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ব্যাপক মাত্রায় কমে এলেও বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময় থেকেই দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার ধারাবাহিক গতিতে বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে গত দুই বছরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায়। ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৭ শতাংশেরও বেশি এখন খেলাপির খাতায় উঠেছে। অথচ ২০০৯ সালেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
ব্যাংক নির্বাহী ও এ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় দশকে ভারতের অনেক মন্দ দিক এ দেশের রাজনীতিবিদ ও আমলা অনুসরণ করেছে। কিন্তু দেশটির কোনো ভালো দিক অনুসরণ করে নিজেদের উন্নতি করার চেষ্টা হয়নি। গভর্নর হিসেবে রঘুরাম রাজন ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নররা নিজেদের সঁপে দিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ও অলিগার্কদের কাছে। তবে এখন আরবিআইয়ের আদলে বাংলাদেশেও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ওপর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে ‘ফ্রড’ ঘোষণার নীতি চর্চা শুরু করা দরকার বলে মনে করছেন তারা।
লেখক ও ব্যাংকার ফারুক মঈনউদ্দীনের ভাষ্য, ভারতের ব্যাংক খাত থেকে আমরা অনেক কিছুই নিয়েছি। কিন্তু কোনো কিছুই ঠিকমতো বাস্তবায়ন করিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণার নীতি চালু করে। ২৪ বছর পর এসে আমরা ২০২৩ সালে এটি আইনে সংযোজন করেছি। আইন হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করার জন্য একটি সার্কুলার দিয়েছিল। কিন্তু সে সার্কুলারটির অনেক কিছুই ছিল অস্পষ্ট ও দায়সারা। এখন পর্যন্ত দেশে কাউকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ঘোষণা করা হয়েছে বলে শুনিনি।’
ফারুক মঈনউদ্দীন বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান। দেশের ব্যাংক খাতের বিরাজমান পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিগত সরকার বড় বড় ঋণখেলাপিদের ধরতে চায়নি। কারণ বড় ঋণখেলাপিরা সরকারের লোক ছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে পড়ে কিছু লোকদেখানো সংস্কার কার্যক্রম নিয়েছিল। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়ন করেনি। এ কারণে ব্যাংক খাত এতটা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। এখন ব্যাংক খাতকে আমূল সংস্কার করার সময় চলছে। চিহ্নিত লুটেরা ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে তবেই ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ‘ফ্রড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ক নির্দেশিকায় ‘ফ্রড’ বলতে এমন কোনো কাজকে বোঝানো হয়েছে, যা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণা, প্রতারিতকরণ, গোপন তথ্য ব্যবহার বা বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতি করে। এতে ১১ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘ফ্রড’ বা প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো তহবিলের অপব্যবহার ও বিশ্বাসভঙ্গ, নকল দলিল ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন, জাল অ্যাকাউন্ট ও হিসাব জালিয়াতি, পরিচয় গোপন করে বা প্রতারক সেজে প্রতারণা, জাল দলিল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি, হিসাবপত্র বা দলিল ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত বা নষ্ট করা, ঘুস বা অবৈধ সুবিধা পেতে ঋণ জালিয়াতি, নগদ ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রাসংক্রান্ত প্রতারণা, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ব্যাংকিং জালিয়াতি এবং এসবের বাইরে অন্যান্য প্রতারণা। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকেও এ নির্দেশনার আওতায় ‘ফ্রড’ সাব্যস্ত করা হয়েছে।
‘ফ্রড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ নির্দেশিকার আওতায় ব্যাংকগুলোর জন্য ফ্রড রিপোর্টিংয়ের নিয়ম চালু করে আরবিআই। এ রিপোর্টের নাম দেয়া হয়েছে ‘ফ্রড মনিটরিং রিটার্ন বা এফএমআর’। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চার ধাপে অনলাইনে এ বিষয়ে রিপোর্ট করতে হয়। এগুলো হলো প্রতারণার প্রাথমিক সন্দেহ, প্রতারণা নিশ্চিতকরণ, আরবিআই, সিবিআই, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদন। সন্দেহজনক ঘটনা ২১ দিনের মধ্যে রিপোর্ট করতে হয়। আর প্রতারণার বিষয়ে নিশ্চিতকরণ ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে হয় যথাক্রমে তিন মাস ও ছয় মাসের মধ্যে। ফ্রড মনিটরিং কমিটি নামে ভারতের প্রতিটি ব্যাংকে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি রয়েছে। এ কমিটি ফ্রড প্রতিরোধ, তদন্ত ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। কোনো ব্যাংকে ১ কোটি বা তার চেয়ে বেশি রুপির প্রতারণা সংঘটিত হলে সিবিআই বা পুলিশের কাছে মামলা দায়ের বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়া হয়।
আরবিআইয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে (এপ্রিল ২০২৩-মার্চ ২০২৪) দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ৩৬ হাজার ৭৫টি ফ্রড কেস রিপোর্ট করেছে। এসব কেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৯৩০ কোটি রুপি। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফ্রড কেস রিপোর্ট হয়েছে ২৩ হাজার ৯৫৩টি। এসব মামলার অর্থমূল্য ছিল ৩৬ হাজার ১৪ কোটি রুপি।
২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে দেশের সরকারি-বেসরকারি বেশির ভাগ ব্যাংকে নজিরবিহীন লুণ্ঠন হয়েছে। এ কারণে দেশের দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংকের পরিস্থিতি এখন খুবই নাজুক। ঋণের নামে এসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে, এখন যার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তুমুল সমালোচনার মুখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২০২৩ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এতে ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান যুক্ত করা হয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হলেও এখন পর্যন্ত দেশের কোনো ঋণখেলাপিকেই ‘ইচ্ছাকৃত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। আইনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংজ্ঞায় বলা হয়, ইচ্ছাকৃত ঋণগ্রহীতা হিসেবে তারা গণ্য হবেন, যারা (১) ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ঋণ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ করেন না, (২) জালিয়াতি, প্রতারণা বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ঋণ গ্রহণ করেন, (৩) যে উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছিল, তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বা ব্যবসায় সেই ঋণ ব্যবহার করেন এবং (৪) ঋণের বিপরীতে দেয়া জামানত ব্যাংকের অগোচরে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলেন।
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত না করতে পারার বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেরত দিচ্ছে না, বিগত সময়ে তারা সীমাহীন প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা অনেক ব্যাংকেরই ছিল না। এ কারণে আইনে যুক্ত হওয়ার পরও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করার উদ্যোগ এগোয়নি। এখন ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিছু চিঠি চালাচালি চলছে। সমস্যা হলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ এখন জেলে আছে।’
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদলে বাংলাদেশেও ‘ফ্রড’ ঘোষণার নীতি চালু করা দরকার বলে মনে করেন এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। গভর্নর স্যার নিজেই বলছেন, খেলাপির হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে রাষ্ট্রের সব পক্ষকে এক হতে হবে। কারণ ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত থেকেই ঋণ বিতরণ করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও বলছেন, দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়া বড় গ্রাহকদের অনেকেই এখন লাপাত্তা। তাদের কাছ থেকে ব্যাংকের অর্থ আদায়কেই এখন বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তিনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বড় গ্রাহকদের অনেককে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এতটা বেড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আশা করছি, সংস্কার শেষে ব্যাংক খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’